ইংলিশ অলিম্পিয়াড গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠিত

ইংলিশ অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ পৌঁছাবে বিশ্বব্যাপী
ইংলিশ অলিম্পিয়াড এবং ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড অর্গানাইজেশন ফর চ্যারিটির (WOC) যৌথ উদ্যোগে এবছর সারাদেশে আয়োজিত হয়েছে জাতীয় ইংলিশ অলিম্পিয়াড সিজন-২। জেলাভিত্তিক বাছাই পর্ব (৫০ হাজার শিক্ষার্থী ) , বিভাগভিত্তিক থিয়েটার পর্ব (৫ হাজার শিক্ষার্থী ) থেকে বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ইংলিশ অলিম্পিয়াডের সিজন-২-এর গ্র্যান্ড ফিনালে।  ৯-১০ জানুয়ারী ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পর্দা নেমেছে ইংলিশ অলিম্পিয়াড সিজন-২ গ্র‍্যান্ড ফিনালের। অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে গ্র‍্যান্ড ফিনালে শেষ করেছে ইংলিশ অলিম্পিয়াড।
‘ইন্সপায়ারিং লিডারশিপ’ শ্লোগান নিয়ে এগিয়ে চলা ন্যাশনাল ইংলিশ অলিম্পিয়াডের দ্বিতীয় আসর নিয়ে বেশ উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে। প্রতিযোগিতাটি যথাক্রমে বাছাই পর্ব (জেলাভিত্তিক), থিয়েটার পর্ব (বিভাগীয়) এবং গ্র‍্যান্ড ফিনালে এই তিনটি আলাদা আলাদা পর্বে আয়োজিত হয়। বাছাই পর্বে পরীক্ষার মাধ্যমে ইংরেজিতে দক্ষতা যাচাই করা হয়। ক্লাস অনুযায়ী প্রতিযোগীদের এই প্রতিযোগিতার জন্য ৬টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। গ্রুপগুলো হচ্ছে:
১. কিডস (প্লে-২য় শ্রেণী পর্যন্ত)
২. স্মল স্টার্টস (৩য়-৫ম শ্রেণী পর্যন্ত)
৩. জুনিয়র্স (৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণী পর্যন্ত)
৪. হাই ফ্লায়ার্স (৯ম-১০ম শ্রেণী)
৫. ট্রেইলব্লেজার্স (১১শ-১২শ শ্রেণী)
৬. সিনিয়র্স (উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পর যেকোনো শিক্ষার্থী)।
দুইদিনব্যাপী ইংলিশ অলিম্পিয়াডের গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা-উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এম.পি। তিনি ইংরেজি শেখায় প্রযুক্তির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন এবং সবাইকে গতবাঁধা শিক্ষার মাঝে বন্দী না থেকে প্রযুক্তির সাহায্যে নিজে নিজে ইংরেজি শেখার জন্য উৎসাহিত করেন। এরপর বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ম গভর্নর এবং ইংলিশ অলিম্পিয়াডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ড. আতিউর রহমান।
এই গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠানের পুরস্কার বিতরণ করেন পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. চৌধুরী নাফিজ শারাফাত। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন স্টার্টআপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ উপদেষ্টা টিনা এফ. জাবিন, আই ডি আর এ মেম্বার ড. মোশাররফ হোসাইন, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মফিজুর রহমান, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশের প্রফেসর এস এম আরিফুজ্জামান এবং ইংলিশ অলিম্পিয়াডের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আমানউল্লাহ। ইংলিশ অলিম্পিয়াডের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আমানউল্লাহ বলেন, “পৃথিবীর অন্যান্য অলিম্পিয়াডের মতো ইংলিশ অলিম্পিয়াডকে আমরা পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেব যার নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশের তরুণরা.” তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা এই প্রতিজ্ঞা করব যে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে সমার্থক করে পৃথিবীর একটি উন্নত জাতিতে সমৃদ্ধ নাগরিক এবং নেতৃত্ব প্রদান করতে সহায়তা করবে ইংলিশ অলিম্পিয়াড। বৈশ্বিক নাগরিক হতে ইংরেজী ভাষাসহ অন্যান্য ভাষা শিখতে শিক্ষার্থীদের এবং অভিভাবকদের আহবান জানান তিনি। বৈশ্বিক নাগরিক তৈরীতে ইংলিশ অলিম্পিয়াড খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন।
দুইদিনব্যাপী ইংলিশ অলিম্পিয়াডের গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠানের পুরস্কার বিতরণ করেন পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. চৌধুরী নাফিজ শারাফাত। তিনি প্রতিযোগী এবং বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান। এরপর বিজয়ীদের মাঝে নগদ ৩০০,০০০ (তিন লক্ষ ) টাকার চেক ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী তুলে দেন তিনি। এরপর তিনি কানাডায় অনুষ্ঠিতব্য ইংলিশ অলিম্পিয়াড সিজন-৩ এ সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বিজয়ীরা হলেন-
কিডস
১ মুবাশশিরা ইবনাত- ডারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা।
২ জায়মা জাহান ওয়ারা- উইলিয়াম কেরি একাডেমি, চট্টগ্রাম।
৩ ওমেরা ফিদান- ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজ, চট্টগ্রাম।
স্মল স্টার্টস
১ মিসবাহ উদ্দিন ইনান- চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ, চট্টগ্রাম।
২ খলিলুল্লাহ- খুলনা জিলা স্কুল, খুলনা।
৩ রুদাইনা হক- প্যারামাউন্ট স্কুল এন্ড কলেজ, রাজশাহী।জুনিয়রস
১ মেহনুর শামিমা হক- চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ, চট্টগ্রাম।
২ মাধুর্য রহমান- ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ, ময়মনসিংহ।
৩ রওশন তাবাসসুম জাইমা- ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ, ময়মনসিংহ।

হাই ফ্লায়ার্স
১ তাহিয়া আসওাদ অরনী- দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল এন্ড কলেজ, রংপুর।
২ যায়েদ ইকরাম- ম্যানগ্রোভ স্কুল, ঢাকা।
৩ মুনতাসির মনোয়ার- ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ, ঝিনাইদহ।

ট্রেইলব্লেজারস
১ রিফাহ তাসনিয়া সুপ্রভা- স্কলারসহোম, সিলেট।
২. নাফিসা তাসনিমাহ- সিলেট সরকারি কলেজ, সিলেট।
৩. জিয়াউল হক- বরিশাল ক্যাডেট কলেজ, বরিশাল।

সিনিয়রস
১ রাহাগীর সালেকীন- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা।
২. মির্জা ইফাত নুর- র্রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
৩ প্রজ্ঞা পারমিতা বোস- বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল।

জন পল সার্জেন্ট
প্রিন্সিপাল, ব্লেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।
জামাল উদ্দিন জামি
ডিরেক্টর, সিপিডিএস
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি।
রুশদিনা খান
মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য,
লিডিং করপোরেট ট্রেইনার।
মোহাম্মদ আজিজুল কাদের
ফরমার এ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি-আইইএলটিএস-লিসেনিং,
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিনিস্টার।
কামরুল হাসান
ফাউন্ডার, সিকেএইচ নেটওয়ার্ক।
বিচারকরা সারাদিন প্রতিযোগীদের পরীক্ষা নেন এবং তাদের বিভিন্ন স্তরের দক্ষতা যাচাই করেন। ইংলিশ অলিম্পিয়াড বাংলাদেশে প্রথমবার শিক্ষার্থীদের ফোর-সি ব্যান্ড স্কোর প্রদান করে। ইংলিশ অলিম্পিয়াডের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, “একুশ শতকে নিজেকে দক্ষ একজন বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চারটি দক্ষতা অর্জন জরুরি। এগুলো হচ্ছে- কমিউনিকেশন, কোলাবরেশন, ক্রিয়েটিভিটি এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিং। এগুলোকে আমরা ফোর-সি হিসেবে চিনি। ইংলিশ অলিম্পিয়াড শিক্ষার্থীদের এই চারটি দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করছে। আমরা আমাদের গ্র্যান্ড ফিনালেতে প্রতিযোগীদের এই চারটি দক্ষতা পরীক্ষা করেছি এবং এর উপর ভিত্তি করে তাদের ফোর-সি ব্যান্ড স্কোর প্রদান করেছি।”
সারা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে ৫০,০০০ প্রতিযোগী থেকে ৩৮০ জনকে বাছাই করা হয় গ্র‍্যান্ড ফিনালেতে যোগ দেয়ার জন্য। প্রথমদিন ইংলিশ অলিম্পিয়াডের অভিজ্ঞ বিচারকমন্ডলী এদের নানাভাবে পরীক্ষা করেন তাদের ইংরেজির দক্ষতা যাচাই করতে। এই ৩৮০ জন থেকে বিচারকরা ৬০জনকে বাছাই করেন সেরা হিসেবে। এই ৬০ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় দিন প্রতিযোগিতা হয় সেরাদের সেরা নির্ধারণের জন্য। আরও কিছু পরীক্ষা নেয়ার পর অবশেষে ইংলিশ অলিম্পিয়াড ঘোষণা করে তাদের সেরাদের সেরা ১৮ জন।
ডেইলি স্টার, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ডব্লিউওসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, সিকেএইচ নেটওয়ার্ক, ইয়ুথ অপারচুনিটিজ, কেবল নিউজ ইন্টারন্যাশনাল, সিএমইডি, ইস্পাহানি, স্টার্ট আপ চট্টগ্রাম, বোম্বে সুইটস, স্মার্ট ফ্যামিলি, রেড ব্রিক, এমএফ ইন্টারন্যাশনাল, কালার্স এফএম, সমকাল, তালিশমান, এভারেস্ট মিনারেল ওয়াটার, লাইট অফ হোপ, ইউরব্যাকঅফিস, আমরা, চ্যানেল ৭১ এর মতো অসাধারণ অংশীদারদের সহযোগিতায় ইংলিশ অলিম্পিয়াড সিজন-২ এর গ্র্যান্ড ফিনালে প্রতিযোগিতার সফল সমাপ্তি উদযাপিত হয়েছে।
এবছর ইংলিশ অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় এবং আরো ২৫টি দেশে আয়োজন করতে যাচ্ছে ইংলিশ অলিম্পিয়াড সিজন-৩। ইতোমধ্যে তাদের ওয়েবসাইটে (englisholympiad.net) সিজন ৩ এর রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তের শিশু কিশোর এবং তরুণদের মাঝে ইংরেজীকে আরও জনপ্রিয় এবং প্রতিযোগিতামূলক করতে কাজ করে যাচ্ছে ইংলিশ অলিম্পিয়াড। একইসাথে ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরীতেও ইংলিশ অলিম্পিয়াড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইংলিশ অলিম্পিয়াডের বর্তমান পরিকল্পনা- ২০২০ সালের মধ্যে ২৫ টি দেশে (যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়) ইংলিশ অলিম্পিয়াড আয়োজন করা এবং ২০২১ সালের মধ্যে ১০০টি দেশে এই প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেয়া। ইংলিশ অলিম্পিয়াডের চিফ অরগানাইজার মোহাম্মদ আমান উল্লাহ জানান, “বর্তমান বিশ্বে নিজেকে সেরা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন যোগাযোগ, সৃজনশীলতা, সমন্বয় এবং যৌক্তিক চিন্তাধারা। ইংলিশ অলিম্পিয়াড এই গুণগুলো চর্চা করে এবং অন্যদেরও চর্চায় উৎসাহিত করে। আমরা যদি এখন থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে এই দক্ষতাগুলি অর্জনে উৎসাহ দিই তাহলে ভবিষ্যতে আমরা এমন একটি জেনারেশন আশা করতে পারব যারা দেশের চেহারাটাই বদলে দিতে পারবে।”। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট সদস্য ও ইংলিশ অলিম্পিয়াডের উপদেষ্টা এস এম আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ম্যানেজমেন্ট ও ইনোভেশনে পিছিয়ে আছি। এর মূল কারণ হলো ইংরেজিতে দুর্বলতা। ইংলিশ অলিম্পিয়াড শুধু যে আমাদের এই দিকগুলি এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে তাই নয়। বরং আমাদের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীর সাথে পরিচিত হতে এবং সেই পৃথিবীর অংশ হয়ে উঠতে সাহায্য করছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে এবং প্রাইভেট সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও সহযোগিতা করবে।”
ইংলিশ অলিম্পিয়াডের প্রতি মানুষের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকরা সকলেই প্রচন্ড উৎসাহী ইংলিশ অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়ার ব্যপারে। একজন অভিভাবক বলেন,”আমার মেয়ে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ইংরেজী পত্রিকা কিনে পড়ে। আমি যখন জিজ্ঞাসা করি তখন সে জানায়, সে ইংলিশ অলিম্পিয়াডের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইংলিশ অলিম্পিয়াড আমার সন্তানের শেখার আগ্রহটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, এটা সত্যিই অনেক বড় একটা ব্যাপার।” ইংলিশ অলিম্পিয়াডের আয়োজকরা আশা করছেন এভাবে ইংরেজি শেখার আগ্রহটা সারাদেশ এবং সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে একদিন।